x

Zakiganj

Zakiganj.com-এ আপনাকে স্বাগতম।

"জকিগঞ্জের মাটি ও মানুষের প্রতিচ্ছবি"

জকিগঞ্জ

Zakiganj

জকিগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার ও প্রবাসী অবদান তুলে ধরার একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম।"

[zakiganj] / results=[2] / label=[latest] / type=[headermagazine]
শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

জকিগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা জহর সেন: নীরবতার আড়ালে এক অনালোচিত ইতিহাস ।

জকিগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা জহর সেন: নীরবতার আড়ালে এক অনালোচিত ইতিহাস । Zakiganj News
প্রকাশঃ
0 জন এই প্রতিবেদনটি পড়েছেন

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হলেও, আরও বহু নাম নীরবতার আড়ালে থেকে গেছে—যাদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। সিলেটের জকিগঞ্জের কিশোর গেরিলা যোদ্ধা জহর সেন তেমনই এক বিস্মৃত অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। মহান বিজয় দিবস, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ সাংবাদিক দেবদুলাল মুন্না একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জহর সেনের জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে নতুন করে জনসমক্ষে তুলে আনেন।



শ্রীমঙ্গল কলেজ রোডের শ্রীমঙ্গল আদর্শ কলেজের সাবেক প্রভাষক এবং বর্তমানে ঢাকাভিত্তিক সাংবাদিক দেবদুলাল মুন্না তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেন, জহর সেনের একটি ছবি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ালেও তা অনেক সময় আবিষ্কারের দাবি করে শেয়ার করা হয়েছে। তবে জহর সেনকে নিয়ে প্রথম তথ্যভিত্তিক লেখা প্রকাশ করেন মুন্না নিজেই, ২০১৯ সালে; পরবর্তীতে ২০২১ সালে তা সংশোধিত তথ্যসহ হালনাগাদ করা হয়।

কিশোর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন জহর সেন। প্রথমে কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ করেন এবং পরবর্তীতে হবিগঞ্জের বাহুবলে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

মুন্নার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন সময়ে জহর সেন ১৭ জন পাকিস্তানি সেনা এবং আল-বদর বাহিনীর দুই সদস্যকে হত্যা করেছিলেন—যা বিভিন্ন সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতির ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের সমাপ্তি তার জীবনে বয়ে আনে নির্মম বাস্তবতা।

স্বাধীনতার পর বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন তার পরিবার বিধ্বস্ত—একজন কাজিন নির্যাতনের শিকার এবং তার মা-বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়; ফলে বিজয়ের আনন্দও তার জীবনে শান্তি বা নিরাপত্তা বয়ে আনতে পারেনি।

জহর সেন কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেননি। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে নিজেকে অনিরাপদ মনে করে ধীরে ধীরে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি ভারতে পাড়ি জমান এবং শেষ পর্যন্ত আসামের বর্তমান শ্রীভূমিতে (সাবেক করিমগঞ্জ জেলার অংশ) বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ সময়গুলো তিনি সেখানেই প্রায় নিভৃতেই কাটান।

মুন্না পরিবারের এক সদস্যের বরাতে নিশ্চিত করেন, ২০২৩ সালের ২৪ জুন শ্রীভূমিতে জহর সেন মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মাননা ছাড়াই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

মুন্না আরও জানান, তার লেখার প্রেরণায় নির্মাতা কাওসার চৌধুরীসহ দুই তরুণ জহর সেনকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পর্দায় জহর সেনের জীবনচিত্র এখনো অদেখাই রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র হিসেবে মুন্না উল্লেখ করেন মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী এবং পিএস সালেহউদ্দিন রচিত ‘সিলেটে মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থের কথা। এছাড়া ১৯৮৮ সালে জহর সেনের সঙ্গে তার নেওয়া একটি সাক্ষাৎকার ‘প্রিয় প্রজন্ম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, যদিও সেই সংখ্যাটি বর্তমানে তার কাছে সংরক্ষিত নেই।

জহর সেনের যে ছবিটি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি সংরক্ষিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে; ফরাসি আলোকচিত্রী অ্যান দ্য হেনিং ছবিটি ধারণ করেছিলেন। এর বাইরে তার জীবনকাহিনি মূলত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত তালিকায় জহর সেনের নাম নেই এবং তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় পদকও পাননি। স্বাধীনতার পর ভারতে অবস্থান করেও তিনি নিজের জন্য কোনো স্বীকৃতি চাননি। ব্যক্তিগত অনিরাপত্তা, যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা এবং পারিবারিক ট্র্যাজেডিই হয়তো তাকে এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করেছিল।

তবে এসব কিছুই তার অবদানকে খাটো করে না। রাষ্ট্রীয় তালিকার বাইরে থেকেও জহর সেন নিঃশব্দে নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য লড়েছেন। তার গল্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধ কেবল তালিকা, পদক বা পরিচিত নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অসংখ্য অজানা বীরের সম্মিলিত আত্মত্যাগের এক মহাকাব্য।

মহান বিজয় দিবসে জহর সেনের মতো বিস্মৃত বীরদের স্মরণ করাই হতে পারে ইতিহাসের প্রতি আমাদের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ শ্রদ্ধা।

সূত্র:Hindupost
This theme has been developed by OURISLABD.

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%
ফলো করুন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন